ফরিদপুরঃ না পাওয়া এক আজব ক্ষত!

জীবনের সবচাইতে সেরা ১৪টা দিন কেটেছিল ফমেক সিসিইউতে। সৃষ্টিকর্তা আবার কবে কোন একটা সিসিইউতে অধিকার নিয়ে ঢুকার সুযোগ দিবেন, কিংবা আদৌ দিবেন কিনা সে সুযোগ, জানা নেই।

সিসিউর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। রাতের বেলা কাউসার ফাহিম এসে বইসা থাকতো প্রায়ই। সাথে থাকতেন মাসুদ ভাই। ঝুমুর ম্যাডাম আর আসাদ স্যার এর আন্ডারে অল্প কিছুদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছিল সিসিইউর এই ১৪ দিনই।

যদ্দুর মনে পড়ছে মোটা বন্ধু শারমিন সুমি ছবিটি তুলেছিল। মৌমিতা দাস বেশি খেয়ে সকালবেলা নড়তে পারছিলোনা। আসাদ স্যার সেদিন আউটডোরে ছিলেন।

অনেকদিন হলো কোন রোগীর সংস্পর্শ পাইনা। ইচ্ছা করে মানুষের বুকের ধুকপুকানি শুনতে, শ্বাস-কাশের আওয়াজ নিতে। কিন্তু কোথায় পাই!
বাসায় কেউ আসলে বাবা বলেন উনার প্রেশারটা মাইপা দেও। আমি মেপে দেই। তাতেও খুব আনন্দ হয়।
বাসার নিচে একজন দারোয়ান আছেন। একদিন খেয়াল করলাম উনার হাতে ক্লাবিং।

উনাকে বললাম, আংকেল আপনি কি সুস্থ আছেন, নাকি কোন অসুস্থতা আছে?
উনি বললেন, সুস্থ আছি

বললাম, একদিন উপরে আইসেন, আপনারে একটু দেখবো।


আমি আশায় বুক বাধি, এই বুঝি কলিং বেল বাজলো, এই বুঝি আংকেল ডেকে উঠলেন, আমার নখগুলা এমন কেন একটু দেইখা দাও ত ডাক্তার।
কিন্ত সেই আংকেল আর আসেন না। আমি ঘরে বসে ক্লাবিং এর কারণ মুখস্ত করতে থাকি।
C তে Congenital cyanotic heart disease
L তে Lung Abscess
U তে Ulcerative Colitis
ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাইহোক, গান শুনছিলাম। অর্ণব এর।

…………..
শূন্যে হাটি শুনে ভাসি
না পাওয়া এক আজব ক্ষত
রাতের তারায় একলা হাসি।

https://youtu.be/NeYfE3uhRbQ

হঠাৎ মাথায় আসলো, এতবছর থাকলাম ফরিদপুরে। বন্ধুবান্ধবের সাথে খাইতে যাওয়া, আর নিখাদ মজা করা ছাড়া আর কখনো মিনিংফুল, আবেগী ছবিটবি পোস্ট করিনাই তেমন। অথচ ছবিগুলা দেখলে হঠাৎ কেমন করে উঠে। ঝুমুর ম্যাডাম আর মৌমিতা দাসের সাথের ছবিটা দেখে বুকটা ঠিক কেমন যে করে উঠলো! আহারে ফমেক সিসিইউ! দ্য লাভ অফ মাই লাইফ!


অক্টোবরের শেষের দিকে OET নামের একটা ভিনদেশী ভাষার পরীক্ষা দিলাম, পাশও করলাম। ভাল লাগলো, কিন্তু আনন্দ লাগলোনা। শকে যাওয়া রোগীর বিপি একটু করে বাড়লে যে শান্তিটা পাইতাম, সেইটা পাইনা। সেদিনের ইনফেরিওর MI উইথ রাইট ভেন্ট্রিকুলার ইনফার্কশনের রোগীটাকে সকালবেলা বসে নাস্তা করতে দেখে বুকটা যেভাবে ভরে উঠেছিল, তার সিকিভাগও খুশি লাগলোনা। একদিন রতনদেব ডেকে নিছিলো ইউনিট ২ তে অভিজিত স্যারের একটা রোগী দেখাইতে। সেদিনের ওই Systemic Sclerosis এর রোগীর কথা মনে পড়লে আজও একটা অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি হয়, কারে বুঝাই!

একটা ব্যাগ আছে আমার। নীল রঙ এর। ওই ব্যাগের স্ট্র‍্যাপের উপর এম্ব্রোয়ডারি করে আমার নাম লেখা। ইন্টার্নশিপের সময় এই ব্যাগটা সাথে নিয়ে ঘুরতাম। কত কিছু আছে এতে! গ্লুকোমিটার থেকে পালস অক্সিমিটার, মাইক্রোপোর, পিন, হ্যামার, ব্রাশ, টাং ডিপ্রেসর। স্টেথো বিপি তো আছেই। ছোটভাই নির্ঝর বাবুনগরীর খুব লোভ আমার এই ব্যাগটার উপর। আমি প্রায়ই ব্যাগের যন্ত্রপাতি গুলো বের করে সযত্নে মুছে আবার ব্যাগে রাখি। বাবুনগরী তখন আমার পাশে বসে বসে দেখে। ক্লাস টুতে পড়ে, সবকিছুতেই তার প্রবল আগ্রহ। এইটা কী? ওইটা দিয়ে কী হয়? নানান ভাবে নেড়েচেড়ে সে দেখে সবকিছু।

একদিন বিরক্ত হয়ে বললাম, বাবুনগরী, তুমি এখন আমার রুমে আসবানা। আমি কাজ শেষ করলে তারপর আসবা।
নির্ঝর বললো, ভাইয়া আমি কিছু ধরবোনা, চুপচাপ বইসা থাকবো।
মাঝেমধ্যে ভাবি যে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে কুমিল্লার কোন মেডিসিনের স্যারের চেম্বারে যেয়ে বলি, স্যার আমি বইসা থাকবো, কিছু ধরবোনা। আমারে একটু পাশে বসে দেখতে দেন। যেমনটা নির্ঝর বলে আমাকে।

ফরিদপুর ছেড়ে আসলাম ২ মাস হতে চললো। ফেলে আসলাম কী কী?


আমার সহচর জ্যাকব। এতদিনে বোধহয় মরে গেছে। চলে আসার আগে ওকে খুঁজে এসেছিলাম কয়েকবার পুরাতন ক্যাম্পাসে যেয়ে। পাইনাই। দেশি কুকুর আর কয়দিনই বা বাঁচে!

জ্যাকবের রাজকীয় এই ছবিটা সৌমিক মটুর তোলা। মটুর সাথে খাওতে যাওয়াও মিস করি। :’-)

আর ফেলে আসছি ফমেক সিসিইউকে। একে কিভাবে নিয়ে আসি!

আর ভূতুমকে।
ভাবছেন “ভূতুম” কী?
বছর চারেক আগে দুইদিনের পরিচয়ে হঠাৎ একজকে বলে বসছিলাম, “তোমার নাম ভূতুম। ভূতুম মানে বুঝো?”
আমার ধারণা ছিল ভূতুম শব্দটা আমার নিজের বানানো। পরে একদিন গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম ভূতুম একটা পেঁচা।
যাইহোক, হঠাৎ খেয়াল করলাম এই ভূতুম-তুকুম ডাকার চার বছর হয়ে গেল।
তুকুম, এইটাও একটা নাম! সে বলছিল।
ভূতুম , টুনটুনি, ময়নাপাখি, ভূতিম, তুকুম – সবই নাম। আমি রাখছি।

ঐ ভয়ানক একা চাঁদটার সাথে বোঝাপরা করে যখন আর পেরে উঠছিলাম না, ঠিক তখনি , ষোল সালের নভেম্বর মাসের কোন এক শুক্রবারের বিষণ্ণ বিকেলে গত বর্ষার সুবাস নিয়ে আমার জীবনে ভূতুম এসেছিল। এরপর তার গুনগুন মনের গান কান পেতে শুনতে শুনতে কেটে গেল চারটা বছর।

আমি তারে আদর করে ডাকি ভূতুম। সে ডাকে এই শুনোনা। মাঝে মধ্যে মনে হয় আমার নাম এইশুনোনা“এইশুনোনা আবদুল্লাহ”। আবদুল্লাহ’র ব আর দ আলাদা। 😀

একদিন তারে বললেম, ভূত, আমারে তুমি একটা নাম দাও।
সে বললে, জ্বি না, আমি কাউকে নাম ধাম দেইনা।

এই ঘটনার বছর খানেক পর জানতে পারলাম যে নাম-দেওয়া নেওয়ার এই ঘটনা নিয়ে একটা গান আছে বাংলা ভাষায়। গানের নাম- নাম ছিলোনা। গেয়েছেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব। যাই গানটা শুনে আসি বরং।

তোমার জন্য সকাল দুপুর
বাজিয়ে কোন বিষন্ন সুর
………

:’-)

তোরে মিস করি, ভূতুম।
আর হ্যাঁ, ফমেক সিসিউকেও, দ্য লাভ অব মাই লাইফ।

because you don’t know
What it means to me

ফ্রেডি মারকারির কথাগুলা একটু শুনে আসেন যেয়েঃ
https://youtu.be/v3xwCkhmies

শুভরাত্রি।

Tags:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top